বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৮:২৩ অপরাহ্ন

একবার বাবা ডাকের অপেক্ষা কলমে -বিপ্লব হোসেন
প্রতিবেদক / ৩৮ সময়
আপডেট শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

একবার বাবা ডাকের অপেক্ষা
কলমে -বিপ্লব হোসেন

খোকা; তুই জানিস?
একটা মানুষের বুক কতটা ফাঁকা হলে এত ঝড় ওঠে ভেতরে,
আমি এখন সেই ঝড় নিয়েই বেঁচে আছি।
আমি লেখাপড়া না জানা মানুষ, কিন্তু তোর নামটা বুকের ভেতর এমন খোদাই করে লেখা আছে যে, মুছতে গেলেও রক্ত ঝরে।
তুই তখন খুব ছোট ছিলি,
তোর মায়ের বুকের ফোঁটা ফোঁটা দুধ খেয়ে বড় হচ্ছিলি,
আর আমরা দু’জনে চুপচাপ তাকিয়ে ভাবতাম,
এই ছেলেটা একদিন আমাদের ভাগ্য বদলে দেবে।

খোকা; তুই জানিস?
সেই দুধের প্রতিটা ফোঁটার সাথে মিশে ছিল আমাদের না খেয়ে থাকা কতশত রাত,
আমাদের চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস।
আমি মাঠে হালচাষ করতাম,
রোদে পুড়তাম, বৃষ্টিতে ভিজতাম, তবু মনে হতো এই কষ্টটাই একদিন সুখ হয়ে ফিরে আসবে আমাদের সংসারে।
একবার পায়ে লাঙলের ফলা লেগে গলগল করে বের হয়ে রক্তে ভিজেছিল ধানক্ষেত।
বেশকিছু দিন বিছানায় শুয়ে ছিলাম,
ঠিকমতো ওষুধটুও কিনি নাই শুধু তোর মুখের দিকে তাকিয়ে,
আমার ওষুধের চেয়ে তোর পেট ভরানোটা জরুরি ছিল।
তোর ছোট্ট হাতটা যখন আমার আঙুল ধরে থাকত,
মনে হতো পুরো পৃথিবীটা আমার হাতের মুঠোয়,
প্রতিদিন তোকে কাঁধে তুলে স্কুলে নিয়ে যেতাম,
কাঁধটা ঘামে ভিজে যেত, তবু তোর হাসি দেখে সব ভুলে যেতাম,
তোর বইয়ের গন্ধটা ছিল আমাদের উৎসব, তোর খাতার পাতাগুলো ছিল আমাদের স্বপ্নের জমিন,
আমরা নিজেরা ছেঁড়া কাপড় পরে থেকেছি বছরের পর বছর,
কিন্তু তোর জামাটা যেন নতুন থাকে সেই চেষ্টা করেছি,
তোর মা শীতের রাতে কাঁপতে কাঁপতে তোকে জড়িয়ে ধরে রাখত,
নিজের কাঁপুনি লুকিয়ে বলত,
আমার গরম লাগছে।

খোকা, তুই জানিস?
কতদিন আমরা না খেয়ে থেকেছি শুধু তোর পেটটা ভরে থাকুক বলে,
রাতের পর রাত আমরা ঘুমাতে পারিনি,
তোর ভবিষ্যতের চিন্তা এসে চোখের পাতায় কাঁটা হয়ে বিঁধেছে।
তুই যেদিন লেখাপড়ার জন্য শহরে গেলি, সেদিন উঠোনের সাথে আমার বুকটাও ফাঁকা হয়ে গেল, পাখির ডাকও কেমন যেন থেমে গেল।
তোর খবরের অপেক্ষায় আমরা দরজায় হেলান দিয়ে বসে থাকতাম, হাওয়া এলেও মনে হতো এই বুঝি তুই এলি!
আমি চিঠির পাতার শব্দ পড়তে পারতাম না, তবু তোর চিঠির কাগজটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরতাম,
যেন তোর গায়ের গন্ধটুকু পাই।
তোর খরচের কথা শুনে আমরা কখনো ভয় পাইনি,
শুধু ভেবেছি খোকা যেন থেমে না যায়,
ধান বিক্রি করেছি, গরু বিক্রি করেছি, জমি বিক্রি করেছি, একটার পর একটা ছেড়েছি,
তবু তোর চলার পথটা উন্মুক্ত রেখেছি।

খোকা; তুই জানিস?
তোর মা যেদিন নিজের গয়নাগুলো খুলে আমার হাতে দিয়েছিল, সেদিন তার দু’চোখে পানি ছিল, কিন্তু মুখে সুখের হাসি।
আমি দেখেছি একটা মা কীভাবে নিজের সুখ সন্তানের জন্য বিক্রি করে দেয়।
আমি গয়নাগুলো বিক্রি করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল,
বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে ফেলছি।

জানিস খোকা?
আমরা লবণ দিয়ে ভাত খেয়েছি, তবু কারো কাছে হাত পাতিনি, কারণ তুই ছিলি আমাদের গর্ব,
তোর নামটা যখন কেউ সম্মানের সাথে বলত, মনে হতো এই কষ্ট সব সার্থক।
শেষ পর্যন্ত যখন আর কিছুই রইল না, তখন ভিটামাটিটুকুও বিক্রি করে দিলাম, মাটির সাথে মিশে গেল আমাদের ইতিহাস,
রাস্তার ধারে পরের জমিতে আশ্রয় হলো আমাদের, আকাশটাই হয়ে গেল আমাদের ছাদ,
তুই তখন বড় হচ্ছিস, বড় শহরের আলোয় তোর চোখ ঝলমল করছে, আর আমাদের অন্ধকারটা তোর কাছে অচেনা হয়ে যাচ্ছে।
তুই চাকরি পেলি, অনেক বড় সরকারি চাকরি, খবরটা শুনে তোর মা সিজদায় পড়ে কাঁদতে লাগল,
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলেছিলাম,
এবার বুঝি একটু শান্তি পাবো।
কিন্তু শান্তিটা যেন আমাদের ঠিকানায় এলো না রে,
ভুল ঠিকানায় চলে গেছে,
ধীরে ধীরে তুই দূরে সরে গেলি, তোর সময় কমে গেল, তোর কথাগুলো কমে গেল
আমরা তোর জীবনে ব্যস্ততার ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম, যেন কখনো ছিলামই না আমরা।

খোকা; তুই জানিস?
যে কাঁধে চড়ে তুই স্কুলে গেছিস, সেই কাঁধটা আজ কতটা ফাঁকা লাগে,
যে বুকটা তোকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই বুকটা আজ কতটা হাহাকার করে,
যে হাতটা ধরে তোকে হাঁটতে শিখিয়েছিল, সেই হাতটা আজ কাঁপতে কাঁপতে তোকে খুঁজে বেড়ায়, শুধু একবার ছুঁয়ে দেখতে চায়,
তোর মা এখনো প্রতিদিন ভাত রান্না করে একটু আলাদা করে রাখে,
বলে; যদি হঠাৎ এসে পড়ে!
আমি এখনো রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি,
ধুলো উড়লেই মনে হয় এই বুঝি তুই আসছিস!
দিন যায়, রাত যায়, সময় চলে যায়, তুই আর আসিস না।

জানিস খোকা?
চোখের পানি শুকিয়ে গেছে,
কিন্তু বুকের ভেতরের আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলছে।
আমরা তোকে কোনোদিন দোষ দিইনি, দোষ দেবোও না,
শুধু ভালোবেসেছি, আজও বাসি,
তোর সাফল্যের গল্পে আমাদের কষ্টের জায়গা নেই জানি,
তবুও আমি এখনো গর্ব করে বলি
আমি অমুকের বাপ!
তুই এখন অনেক বড় মানুষ, আমরা ছোট হয়ে গেছি তোর চোখে,
তোর মায়ের কাঁপা হাতটা এখনো তোর মাথায় বুলাতে চায়,
কিন্তু দূরত্বটা এতো বড় যে,
চাঁদের দূরত্বকেও হার মানায়।
আমার ক্লান্ত চোখটা এখনো তোকে একবার দেখতে চায়,
কিন্তু তোর সেই সময় কোথায়,
তুই এখন ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত, এতটাই ব্যস্ত যে আমাদের জন্য একটা মুহূর্তও নেই তোর ঘড়ির কাঁটায়,
আমরা তোর জীবনের পুরোনো অধ্যায়,
যেটা তুই পড়ে শেষ করে বন্ধ করে দিয়েছিস।
কিন্তু সেই অধ্যায়ের প্রতিটা লাইনে আমাদের রক্ত আর ঘাম লেগে আছে।

খোকা, তুই জানিস?
আমরা তোকে সব দিয়েছি, বিনিময়ে কিছু চাইনি কোনোদিন
আজ শুধু একটু সময় চাই,
ভালোবাসা চাই না, অবহেলা করে হলেও তোর মুখে “বাবা” ডাকটা শুনতে চাই,
এই চাওয়াটুকু কি খুব বেশি হয়ে গেল রে?
যে ভিটে ছেড়েছি, সেই মাটিটা আজও আমাকে ডাকে, সেই উঠোনে আজও তোর পায়ের ছাপ পড়ে আছে।
তুই কি কোনোদিন ফিরে গিয়ে দেখবি সেই ছাপগুলো,
নাকি সব মুছে গেছে তোর মন থেকে?
আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু বেঁচে থাকার আনন্দটা হারিয়ে ফেলেছি রে,
তোর অভাবটা আমাদের প্রতিদিন নতুন করে পিষে মারে,
তোর মা রাতে ঘুমাতে পারে না, তোর নাম ধরে ডাকে, কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে,
আমি চুপচাপ বসে থাকি, চোখের পানি লুকাই, কারণ কান্নাটা দেখানোর মতো কেউ নেই।
ছোটবেলায় শুনেছিলাম; পুরুষ মানুষ কাঁদে না, আজ বুঝি,
বাবার কান্না শব্দহীন হয়
তোর জন্য যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটা পূর্ণ হয়েছে ঠিকই,
কিন্তু সেই স্বপ্নে আমরা নেই
তুই সফল, আমরা একা,
তুই আকাশ ছুঁয়েছিস, আমরা মাটিতে পড়ে আছি,
এই দূরত্বটা কে বানিয়েছে; তুই,
না সময়, আমি জানি না,
শুধু জানি, তুই নেই, তবু তোর অপেক্ষা আছে
তোর মা এখনো তোর নাম ধরে ডাকে,
যেন তুই পাশেই আছিস,
আমি শুনে চুপ করে থাকি, কারণ জানি; এই ডাকে তুই আর মা বলে সাড়া দিবি না, তোর কানে এই ডাক পৌঁছবে না।
তুই হয়তো আমাদের কথা ভাবিস না,
কিন্তু আমরা তোকে ভেবেই বেঁচে তো আছি।
আমাদের নিঃশ্বাসে তোর নাম,
আমাদের দোয়ার মধ্যে তোর নাম।
তুই ভুলে গেলেও আমরা ভুলতে পারি না,
কারণ তুই তো আমাদের জীবন,
তোর সাফল্যের পেছনের গল্পটা
এই ঘামে ভেজা শরীর আর ঐ রাত জেগে থাকা একজোড়া চোখ,
তুই হয়তো আর পড়িস না সেই গল্প,
তবু সেই গল্পটা আমাদের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকে
আমরা আজও তোর জন্য দোয়া করি,
যেখানেই থাকিস তুই ভালো থাক, সুখে থাক
তবু জানিস তো; মনের ভেতর একটা ব্যথা রয়ে যায়, যেটার কোনো ভাষা হয় না।
আমি অশিক্ষিত, তাই লিখে বোঝাতে পারি না, শুধু অনুভব করি,
বুকের ভেতরটা মাঝে মাঝে চিৎকার করে ওঠে, বলে ওঠে; একবার ফিরে আয় খোকা,
একবার এসে বল; বাবা, এই তো আমি!
তাহলে হয়তো এই সব কষ্ট গলে যাবে,
তোর মা হাসবে, আমি চোখ মুছব, আবার বাঁচতে ইচ্ছে করবে।

কিন্তু সেই দিনটা আর আসবে না আমি জানি,
শুধু অপেক্ষা বাড়ে,
আমরা অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত আমি,
তবু অপেক্ষার শেষ নেই; কারণ বাবা-মা অপেক্ষা করতে জানে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
হয়তো কোনো একদিন তুই ফিরবি, হয়তো বলবি
বাবা আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে!
সেই আশাটুকু নিয়েই আমরা বেঁচে আছি
এই রাস্তার ধারে, এই ছোট্ট আশ্রয়ে, সব হারানোর মাঝেও একটা জিনিস এখনো বেঁচে আছে; তোকে ভালোবাসা।
এই ভালোবাসা মরে না রে, এই ভালোবাসা ফুরায় না, শুধু অপেক্ষা করে যায়।
হয়তো একদিন, হয়তো কোনো একদিন,
তুই একবার ফিরে ডাকবি বাবা!

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ
জনপ্রিয় সংবাদ
সর্বশেষ

পুরাতন খবর

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
  12345
6789101112
13141516171819
27282930   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728   
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031